রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিরহ কবিতা
বিরহ (ক্ষণিকা কাব্যগ্রন্থ থেকে)
তুমি যখন চলে গেলে তখন দুই-পহর— সূর্য
তখন মাঝ-গগনে, রৌদ্র খরতর।
ঘরের কর্ম সাঙ্গ করে ছিলেম তখন একলা ঘরে
আপন-মনে বসে ছিলেম বাতায়নের 'পর।
তুমি যখন চলে গেলে তখন দুই-পহর।
চৈত্র মাসের নানা খেতের নানা গন্ধ নিয়ে
আসতেছিল তপ্ত হাওয়া মুক্ত দুয়ার দিয়ে।
দুটি ঘুঘু সারাটা দিন ডাকতেছিল শ্রান্তিবিহীন,
একটি ভ্রমর ফিরতেছিল কেবল গুন্গুনিয়ে।
তখন পথে লোক ছিল না, ক্লান্ত কাতর গ্রাম।
ঝাউশাখাতে উঠতেছিল শব্দ অবিশ্রাম।
আমি শুধু একলা প্রাণে অতি সুদূর বাঁশির তানে
গেঁথেছিলেম আকাশ ভ'রে একটি কাহার নাম।
তখন পথে লোক ছিল না, ক্লান্ত কাতর গ্রাম।
ঘরে ঘরে দুয়ার দেওয়া
আমি ছিলেম জেগে—
আবাঁধা চুল উড়তে ছিল উদাস হাওয়া লেগে।
তটতরুর ছায়ার তলে ঢেউ ছিল না নদীর জলে
তপ্ত আকাশ এলিয়ে ছিল শুভ্র অলস মেঘে।
ঘরে ঘরে দুয়ার দেওয়া, আমি ছিলেম জেগে।
তুমি যখন চলে গেলে তখন দুই-পহর
শুষ্ক পথে দগ্ধ মাঠে রৌদ্র খরতর।
নিবিড়-ছায়া বটের শাখে কপোত দুটি কেবল ডাকে
একলা আমি বাতায়নে— শূন্য শয়ন-ঘর।
তুমি যখন গেলে তখন বেলা দুই-পহর।
বিরহ (কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থ থেকে)
আমি নিশি-নিশি কত রচিব শয়ন আকুলনয়ন রে!
কত নিতি-নিতি বনে করিব যতনে কুসুমচয়ন রে!
কত শারদ যামিনী হইবে বিফল, বসন্ত যাবে চলিয়া!
কত উদিবে তপন আশার স্বপন, প্রভাতে যাইবে ছলিয়া!
এই যৌবন কত রাখিব বাঁধিয়া, মরিব কাঁদিয়া রে!
সেই চরণ পাইলে মরণ মাগিব সাধিয়া সাধিয়া রে।
আমি কার পথ চাহি এ জনম বাহি, কার দরশন যাচি রে!
যেন আসিবে বলিয়া কে গেছে চলিয়া, তাই আমি বসে আছি রে।
তাই মালাটি গাঁথিয়া পরেছি মাথায় নীলবাসে তনু ঢাকিয়া,
তাই বিজন আলয়ে প্রদীপ জ্বালায়ে একেলা রয়েছি জাগিয়া।
ওগো তাই কত নিশি চাঁদ ওঠে হাসি, তাই কেঁদে যায় প্রভাতে।
ওগো তাই ফুলবনে মধুসমীরণে ফুটে ফুল কত শোভাতে!
ওই বাঁশিস্বর তার আসে বার বার, সেই শুধু কেন আসে না!
এই হৃদয়-আসন শূন্য যে থাকে, কেঁদে মরে শুধু বাসনা।
মিছে পরশিয়া কায় বায়ু বহে যায়, বহে যমুনার লহরী,
কেন কুহু কুহু পিক কুহরিয়া ওঠে— যামিনী যে ওঠে শিহরি।
ওগো যদি নিশিশেষে আসে হেসে হেসে, মোর হাসি আর রবে কি!
এই জাগরণে ক্ষীণ বদন মলিন আমারে হেরিয়া কবে কী!
আমি সারা রজনীর গাঁথা ফুলমালা প্রভাতে চরণে ঝরিব
ওগো আছে সুশীতল যমুনার জল— দেখে তারে আমি মরিব।
